কুষ্টিয়া ১লা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৫:৪৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৮, ২০২১
ক্ষেতে আগাছা বা পোকামাকড় আক্রমণ এক বড় বিষয়। ফসল বাড়ার সঙ্গে পোকামাকড়ের আক্রমণ তো ঘটেই, সাথে সাথে ক্ষেতে আগাছাও বেড়ে উঠতে থাকে। গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য। পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে ফসলের তো ক্ষতি হয়ই, কিন্তু আগাছাও ফসল নষ্টের জন্য প্রায় ৪০ শতাংশ দায়ী। তাই ফসল ফলাতে গেলে নিয়মিত আগাছা সাফ করতে হবে। পোকামাকড়ের সাথে আগাছা দমন না করলে ফসল ক্ষতির সম্ভাবনা ভীষণ।
আগাছা নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গ আসলেই সবার আগে রাসায়নিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণের চিন্তাভাবনা আমাদের মাথায় আসে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই জমিতে আগাছা দেখলেই ‘রাসায়নিক আগাছানাশক’ (Chemical weedicide/herbicide) প্রয়োগ করেই কৃষকবন্ধুরা এগুলি দমনের চেষ্টা করেন। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন যাবত বাছবিচারহীন ও মাত্রাতিরিক্ত ‘কৃষিবিষ’ প্রয়োগের বহু কুফল আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে তাই আমাদের সকলেরই সুসংহত উপায়ে আগাছা নিয়ন্ত্রণের (Integrated management of weeds) উপর মনোনিবেশ করা উচিৎ।
বাংলাদেশের যে সমস্ত আগাছানাশক বেশ পরিচিতি লাভ করেছে তার মধ্যে রিফিট ৫০০ ইসি, লগরান ৭৫ ডব্লিউজি, লেজার ১০ ডব্লিউপি, গ্রামোক্সোন ২০ এস এল ইত্যাদি অন্যতম।
১) ঘাস জাতীয়
২) মুথা জাতীয়
৩) চওড়া পাতা জাতীয়
বেশ কয়কটি পদ্ধতিতে আগাছা দমন করা যায়। তারই কয়েক সম্পর্কে নীচে বিস্তারিত আলোচনা করা হল:
বর্ষাকালে আগাছা থেকে বাঁচতে গেলে চাষি ভাইদের দ্রুত ফলন হয় এমন ফসলের চাষ করা উচিত। মরসুম অনুযায়ী সবসময় চাষাবাদ করা উচিত। কখনো জমি ফেলে রাখা উচিত নয়, এতে আগাছা বেড়ে ওঠে। খুরপি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার জমি ভালো রাখার অন্যতম প্রাচীন উপায়। লাঙল, হুইল, উইডার, কালটিভেটর যন্ত্রাদির মাধ্যমে ক্ষতিকর আগাছা মাটিতে মিশিয়ে দেওয়াও অন্য আরও এক রকম পদ্ধতি।
এছাড়াও আরও যেসব পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায়:
» যে সমস্ত সবজী খুব দ্রুত বৃদ্ধিদশা অতিক্রম করে (Fast growing crop), তারা সহজেই তাদের শাখা প্রশাখা বিস্তারের মাধ্যমে জমিতে আগাছার প্রকোপ কম করতে পারে।
যেমন- বরবটি, শিম, ভেন্ডি, ফরাস বিনস্ প্রভৃতি।
» একই জমিতে একই গোত্রীয় ফসল বারবার চাষ না করে আলাদা আলাদা পরিবারভুক্ত ফসল চাষ করলে জমিতে আগাছার বাড়-বৃদ্ধি হ্রাস পায়। তাই শস্য আবর্তন (Crop rotation) খুবই জরুরী।
উদাহরনস্বরূপ – প্রতি বছর একই জমিতে টমেটো, মরিচ, বেগুন জাতীয় সবজী চাষ না করে শিম্বী গোত্রীয় ফসল চাষ করা যেতে পারে।
» কিছু কিছু শাকজাতীয় স্বল্পমেয়াদী সবজীর বীজ যেমন, লাল শাক, পুঁই, পালং, কলমি, মেথি ঘন (Dense/ Closer seed sowing) করে বুনলে জমিতে আগাছার বিস্তার অনেকটা প্রতিরোধ করা যায়।
» কম সময় ব্যবধানে ও অগভীরভাবে জমি কর্ষণ করলে বা লাঙল দিলে বার্ষিক আগাছাগুলিকে অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
» জমিতে মূল ফসলের সাথে অন্তর্বর্তী/ সাথী ফসল (Intercrops) চাষ করলে অনেকাংশে আগাছা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। যেমন, বেগুন, টমেটো, বাঁধাকপি যেগুলির সারি ও গাছ প্রতি ব্যবধান বেশী, সেখানে মুলা বা পালং জাতীয় সবজী অন্তর্বর্তী ফসল হিসাবে চাষ করা যাতে পারে।
» মটরের বীজ বপনের সময় কিছুটা বিলম্বিত করলে বথুয়া বা ক্যানারি ঘাস (Phalaris minor) ইত্যাদি আগাছার থেকে অনেকাংশে রেহাই মেলে।
» বীজ বপন বা প্রতিস্থাপনের পর থেকেই সবজী ফসলে সুষম পুষ্টি সরবরাহ সম্ভবপর হলে ও প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী সময়মতো রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে গাছের স্বাস্থ্য ভালো থাকে। স্বাস্থ্যবান চারাগাছ আগাছার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
» মূল জমিতে ফসল লাগানোর আগে মাটির সৌরকরণ (Soil solarization) করলে আগাছার বিস্তার অনেক কম করা সম্ভব হয়।
জৈবিক পদ্ধতিতেও আগাছা দমন করা যায়। আগাছার প্রাকৃতিক শত্রু বিভিন্ন রোগ পোকা অথবা অন্যান্য প্রাণীর মাধ্যমেও আগাছা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। দুধিকানি, বিছুটি, ঘেটু হলদের মতন ফসলের মতন ক্ষতিকর আগাছাকে, মোজাইক ভাইরাস জব্দ করতে পারে। বিশেষ এক শ্রেণীর স্পাইডার মাইট ক্ষেতের আগাছা উত্তম উপায়ে দমন করতে সক্ষম। বাজারেও বিভিন্ন রকমের জৈব আগাছা নিয়ন্ত্রণ আজকাল পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলি ব্যবহার করলেও আগাছা ভালোই নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে।
আগাছা নিয়ন্ত্রণের সুপ্রাচীনতম ও অন্যতম একটি পদ্ধতি হল, হাত দিয়ে, নিড়ানি দিয়ে বা খুরপি দিয়ে আগাছা তোলা। জমির পরিমাণ অল্প হলে খুব সহজেই এই পদ্ধতিতে আগাছা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সাধারণত ফসলের উপর ভিত্তি করে সর্বনিম্ন ২ থেকে সর্বোচ্চ ৪ টি হাত নিড়ানি দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। এছাড়া লাঙল, উইডার, কালটিভেটর ইত্যাদির মাধ্যমেও আগাছা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। জৈব ও অজৈব দু ধরণের উপাদান দিয়ে মালচিং করেও আগাছার প্রকোপ থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে। জৈব উপাদান যেমন খড়, কচুরিপানা, শুকনো পাতা, তুষ, ভুষি ইত্যাদি ও অজৈব উপাদানের মধ্যে প্লাস্টিক ফিল্ম ও বিভিন্ন রঙের পলিথিন দিয়েও মালচিং করা হয়ে থাকে।
রাসায়নিক দিয়েও সহজে আগাছা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। রাসায়নিক, ফসল অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করলে আগাছার দমন ঘটানো সম্ভব। তবে নিয়ম না মেনে ভুলভাল রাসায়নিক প্রয়োগে, ক্ষেতের মাটি থেকে শুরু করে, পশু-পাখি এমনকি মানুষের সমূহ বিপদের আশংকা থাকে।
নির্বাচিত এবং অনির্বাচিত- দুই ধরনের আগাছা নাশক মূলত দেখা যায়। নির্বাচিত আগাছা নাশক প্রয়োগ করলে নির্দিষ্ট কিছু আগাছাকে মেরে দেয়। অনির্বাচিত আগাছা নাশক জমির সমস্ত গাছকে মেরে ফেলে।
আগাছা নাশক, গুঁড়ো আর তরল এই দুইরকমের মূলত হয়। বালি অথবা পানি- এদের দুইয়ের সাথে মিশিয়েই আগাছা নাশক ক্ষেতে প্রয়োগ করা উচিত। মূলত বীজ বোনার আগে, বীজ বোনার পর ও আগাছা জন্মানোর আগে এবং আগাছা জন্মানোর পর এই তিন আলাদা আলাদা সময়ে আগাছা নিয়ন্ত্রক ব্যবহার করা যায়।
কখনোই চোরা বাজার থেকে নিষিদ্ধ আগাছা নাশক কিনে জমিতে প্রয়োগ করা উচিত নয়। নিষিদ্ধ আগাছা নাশকে আখেরে ক্ষতি হবে চাষ যোগ্য জমিরই।
» নির্বাচিত আগাছানাশক (Selective herbicide) – এগুলি কেবল মাত্র বিশেষ বিশেষ আগাছা মারতে সক্ষম (ঘাসজাতীয় অথবা চওড়া পাতা)।
যেমন – পেন্ডিমেথালিন, অ্যালাকলর, অক্সাডিয়াজোন, সিমাজাইন, মেট্রিবুজিন ইত্যাদি।
» অনির্বাচিত আগাছানাশক (Non selective herbicide) – এরা প্রজাতি নির্বিশেষে জমির সমস্ত গাছকে মেরে ফেলে বা তাদের বৃদ্ধিতে বাধা প্রদান করে।
যেমন – ডাইকুয়াট, প্যারাকুয়াট, গ্লাইফোসেট।
» স্পর্শজনিত আগাছানাশক (Contact herbicide) – এগুলি আগাছার সংস্পর্শে এসে আগাছাগুলিকে মেরে ফেলে।
» সর্বাঙ্গবাহী আগাছানাশক (Systemic herbicide) – এই আগাছানাশকগুলি প্রয়োগের পর আগাছার পাতা বা শিকড় দ্বারা শোষিত হয় ও সমগ্র প্ল্যান্ট সিস্টেমে ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে আগাছাগুলি মারা যায়।
যেমন – ২, ৪-ডি, সিমাজাইন।


সম্পাদক: জাহিদ হাসান
© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | কৃষিবিডি.কম, কৃষিবিডি প্রাইভেট মিডিয়া লিমিটেডের একটি প্রতিষ্ঠান।
ইসলাম সুপার মার্কেট (২য় তলা), আমলা, মিরপুর, কুষ্টিয়া-৭০৩২।
যোগাযোগ:
০১৭৮০৮২৭৬০০,
info@krishebd.com
mail.krishebd@gmail.com
Crafted with by Softhab Inc © 2021