আবহাওয়া-জলবায়ুর দুর্যোগে হাবিবুরের ধান দেবে সমাধান

প্রকাশিত: ১১:৩২ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০২৫

আবহাওয়া-জলবায়ুর দুর্যোগে হাবিবুরের ধান দেবে সমাধান
সবাই যখন উচ্চফলনশীল হাইব্রিড বীজের প্রতি ঝুঁকছে, তখন নিজের জমিতে ১৬২টি স্থানীয় জাতের ধান লাগিয়েছেন কৃষক হাবিবুর রহমান। উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগরের পশ্চিম কৈখালী গ্রামের এই কৃষক ধান কাটার মৌসুমে বীজগুলো সংরক্ষণ করেন। এই বীজ দেন অন্যান্য কৃষকদেরও। সেই সাথে বীজগুলো চাষাবাদের পাশাপাশি সংরক্ষণেরও পরামর্শ দেন তাদের।

তার দাবি, স্থানীয় জাতের এই বীজ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বেশ কার্যকর।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, এখানে আমি ১৬২ জাতের ধান লাগিয়েছি, পাশের প্লটেই ব্রি ৫১ লাগিয়েছি। ওই ব্রি ৫১ উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কোনো না কোনো স্থানীয় জাত লেগেছে। এ ছাড়া এখানে যে জাতগুলো আছে তার মধ্যে চিনিকানি, বেগুন বিচি, কালোজিরা, সুভাষ, জেসমিন এই ধানগুলো সুগন্ধি এবং খুবই উচ্চ মূল্যের।

তার মতে, স্থানীয়জাতগুলো উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা এবং বৈরী আবহাওয়া সহনশীল। এই জাতগুলোর সবচেয়ে ভালো দিক হলো এটা চাষ করতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক লাগে না।

হাবিবুর রহমান বলেন, আমাদের এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের যে প্রভাব, এর মধ্যে ঝড়, বন্যা, খরা, শীত এই চারটিই কৃষির সাথে সম্পৃক্ত। এখানে অনেকগুলো জাত আছে, যেগুলো অনেক লবণাক্ততা সহনশীল। যে কারণে এই মাটিতে বা এই জলবায়ুতে টিকে থাকতে পারে। আবার অনেক জাত আছে, যেগুলো ঝড়, এই যে কয়দিন আগে মন্থা হয়ে গেল, এখানে পড়ে গেছে বা পড়ে যেতে পারে, পড়ে গেলে উচ্চ ফলনশীল ধান আর মাথা উঁচু করতে পারে না। কিন্তু স্থানীয় জাতের ধান নিজে থেকেই মাথা উঁচু করে এবং প্রায় ৯০ শতাংশ ফলন দেয়। যেখানে উচ্চ ফলনশীল জাতের ফলন ৩০ শতাংশে নেমে আসে। এ ছাড়া খরার ক্ষেত্রে কিছু জাত আছে, যেগুলো বেশ আগাম। যেখানে পানির রস কম সেখানেও এই ধান লাগানো যায়। অর্থাৎ স্থানীয় জাতগুলো প্রাকৃতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম।

তার দাবি, স্থানীয় জাতের বীজ হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণ হাইব্রিড বীজের আগ্রাসন। কৃষক বুঝে না বুঝে সামান্য ফলন বেশি হওয়ায় হাইব্রিড বীজের প্রতি ঝুঁকছে। কিন্তু এটা ভাবছে না যে, হাইব্রিড বীজের উৎপাদন খরচ দেশীয় বীজের চেয়ে অনেক বেশি। হাইব্রিড বীজ রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ওপরই টিকে থাকে। কিন্তু স্থানীয় বীজ চাষাবাদে সার কীটনাশক লাগে না বললেই চলে।

হাবিবুর রহমানের প্লটে চাষ করা হচ্ছে যেসব ধান

স্বর্ণমাশুরী, ভাওয়াইয়াল্য, সীতাভোগ, গেউস, মালাগাতি, ঝুমকা আমন, রানী স্যালট, চিনিকানি, রনজিত, নোনাকচি, চিনিশাইল, চাঁদমুন্নি, মৌলতা, সাহেবকচি, ইঞ্চি, কলমিলতা, মন্তেশ্বর, তিলবাজাইল, ছিয়ার, নেপালী, দারশাইল, বেনাপোল, আবজী, স্বর্ণা, মরিচশাইল, কাজলশাইল, খাইনল, চাপনালী, ভরত, নেড়াবেত, ভোলানাথ, নারকেলমুচি, খ্যাকশাইল, ঘুন্সি, পংকীরাজ, জয়শ্রীরাম, ন্যাড়াজামাইনাড়ু, আতব, ক্ষীরকুন, মালতি, কালশি, রিতু পাইজাম, আগুনাবিন্নী, সুভাস, বহুরীমোটা, নরসিংহজোটা, গানজিয়া, কুটেপাটনাই, সৈয়দমোটা, রুপশাইল, তেজমিনিকেট, খাড়ামোটা, দিশারী, মধূশাইল, মালা, চিনিসাগর, স্বর্ণপংকজ, বদ্দীরাজ, মগাইবেতী, বুকাইরা, রাজাশাইল, বাবুই, সাগরফণা, হরি, কাঁচড়া, বোরোঝাঁপি, ক্যাশরাইল, তেইশবালাম, আঁশফাইল, সাদাগোটাল, বৌসোহাগী, আইজং, সতীন, গোবিন্দভোগ, গচি, সাদাস্বর্ণা, নাজিরশাইল, চরোবালাম, ক্যারেংগাল, গুটিস্বর্ণ, কালোমোটা, গারোআইজং, দুধকলম, বেগুনবিচি, হরগোজা, খাসকিনি, মোতামোটা, সোনালী পাইজাম, আরমান খাসকিনি, পিপড়ার চোক, কেওয়ামৌ, বাঁশমতি, ব্লাকরাইচ, দুর্গাভোগ, খাবুল দুলহান, খেজুরছড়ি, হোগলা, জটাইবালাম, রুপেশ্ব র, গচ্চা, বাঁশফুলবালাম, বজ্রমুড়ি, রহমান ইরি, অহনা, কালোজিরা, চরবলেশ্বর, সিলেটবালাম, লিলি, কিরনশাইল, ঢেঁকীমালা, চাঁদমুনি, মগাইবালাম, চাপশাইল, ঘি-গজ, ডাকশাইল, হলদে গোটাল, কাটারীভোগ, তুলশিমালা, পোকখালী, বোরোঝাঁপী, হাতিবজোড়, গেড়িমুড়ি, পাটনাই, কস্তুরি, কাঠিগচ্চা, লালগোটাল, জেসমিন, আলী কাঞ্চন, ময়নামতি, বিন্নী, মহিনীস্যালট, লালকুমড়ী, কাঞ্চন, কাডিভিট, বিরুইন, লালমোটা, কুমড়াগোড়, হরিশংক, চারুলতা, সকাল উড়ি, পাংগাস, কার্তিশাইল, সুপারশ্যামলী, মালাকীট, জল কস্তুরী, মড়াবাজাল, ভুটেস্যালট, হামাই, সাদামোটা, মইরম, মহিমে, গাবরাইল, সুধা, চাপলী, ইয়রচাউল, তিলেককচি, আইটি, গৌর কাজল, বড়ান ও স্বর্ণলতা।

স্থানীয় জাত সংরক্ষণের আদৌ কোনো গুরুত্ব আছে কি

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং উচ্চ ফলন- সবগুলো বিষয়েরই সমাধান আছে স্থানীয় জাতে। তাই হাবিবুর রহমানকে সহযোগিতার পাশাপাশি তার কাজকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক)।

বারসিকের কর্মসূচি কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ মন্ডল বলেন, স্থানীয় জাত থেকেই কিন্তু বিজ্ঞানীরা, কৃষি বিজ্ঞানীরা, গবেষকরা তাদের গবেষণাগারে যে উচ্চ ফলনশীল বলি, হাইব্রিড বলি, সেই জাতগুলোকে উদ্ভাবন করেছেন। কারণ সবকিছুর মূলে আছে স্থানীয় জাত। এ কারণে স্থানীয় জাত রক্ষা না করলে আমরা কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ গবেষণা বলি, আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের সুরক্ষা বলি, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে অভিযোজন বলি, কিংবা আমাদের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার কথা বলি, সবকিছু হুমকির মুখে পড়বে। কারণ আমাদের সবকিছুর মূলে রয়েছে আমাদের স্থানীয় জাত। এই স্থানীয় জাত সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হচ্ছে হাইব্রিডে। যে কোনো মূল্যে হাইব্রিড থেকে আমাদের বেরুনো দরকার।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এদেশের কৃষি ব্যবস্থার মূলে থাকবে কৃষক। কৃষির মূল উপকরণ বীজ থাকবে কৃষকের কাছেই। কিন্তু হাইব্রিডের আগ্রাসনে স্থানীয় জাতবৈচিত্র্যের বিলুপ্তি ঘটছে।

ক্রমবর্ধমান খাদ্যের চাহিদা পূরণে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনে কাজ করছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)।

স্থানীয় বীজ ও হাইব্রিড বীজের সুবিধা-অসুবিধা ও গুরুত্ব নিয়ে কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির সাতক্ষীরা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. কামরুজ্জামানের সঙ্গে।

তিনি বলেন, স্থানীয় নানা সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে খাদ্য উৎপাদনে স্থানীয় জাতগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের সাতক্ষীরার জন্য কৃষিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা। স্থানীয় জাতগুলোতে ফলন সামান্য কম হলেও এসব প্রতিকূলতা মোকাবিলার ক্ষমতা থাকে। কারণ এসব বীজ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেই টিকে আছে। এখন স্থানীয় বীজের এসব বৈশিষ্ট্য শংকরায়নের মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল জাতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে যে নতুন জাত পাওয়া যাবে, তাতে উচ্চ ফলন ও স্থানীয় প্রতিকূলতা মোকাবিলার উভয় বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাবে। তাহলে কৃষক অধিক ফলন পাবে এবং এটার মধ্য দিয়েই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষিতে নতুন নতুন প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। এগুলো মোকাবিলা করতে স্থানীয় যে বীজ বৈচিত্র্য আছে তা অধিক কার্যকর। এই কারণে বিজ্ঞানীরা স্থানীয় বীজ বৈচিত্র্য সংরক্ষণের ওপর খুব গুরুত্ব দিচ্ছে।

হাইব্রিড বীজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এফ১ জেনারেশনের বীজই মূলত হাইব্রিড বীজ। এই বীজে ফলন দেয় বেশি কিন্তু সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা এই বীজে উৎপাদিত ফসল থেকে বীজ সংরক্ষণ করা যায় না। এই বীজ আমাদের কৃষকরাও উৎপাদন করতে পারে না। এজন্য কৃষকদের স্থানীয় উচ্চ ফলনশীল বীজ থেকে বীজ সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু কৃষকদের অসচেতনতার কারণে বীজ সংরক্ষণের হার কমে যাচ্ছে। এজন্য কৃষি বিভাগ বা বিনা বা অন্যান্য যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, আমরা যদি কৃষকদের বীজ প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ দিতে পারি, তাহলে কৃষকরা নিজেরাই বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে এবং হাইব্রিড বীজের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে।