কুষ্টিয়া ১লা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৮:১১ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৫, ২০২৫
কৃষিবিডি প্রতিবেদক:
কুষ্টিয়ায় বানিজ্যিকভাবে মাশরুম চাষ করে সফল হয়েছেন সদর উপজেলার সাইফুল ইসলাম। চাকুরী হারিয়ে কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে পড়েন তিনি। পরে বাড়ী ফিরে এসে অর্থ সংকটে থাকা সাইফুল ইসলাম মাত্র ৬হাজার টাকা ধার নিয়ে শুরু করেন ১০০টি স্পন নিয়ে মাশরুম চাষ। বর্তমানে তার প্রতিমাসে আয় হয় ১লাখ ৫০ হাজার থেকে ১লাখ ৭০ হাজার টাকার মতো। তার কাছে কাজ করেন ১৫জন শ্রমিক। সেই সাথে সাইফুল ইসলামের কাছ থেকে ৫শতাধিক মানুষ হাতে কলমে প্রশিক্ষণ নিয়ে মাশরুম চাষ করেছেন। এছাড়া প্রতিনিয়ত নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তারা এসে তার কাছ থেকে মাশরুমের উৎপাদন কৌঁশল শিখছেন। একসময় যাকে ব্যাঙ এর ছাতা তৈরি কারণ হিসাবে বন্ধুরাও দুরে ঠেঁলে দিয়েছিলো এখন সাইফুল হাজারো মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা।
কুষ্টিয়া শহরের সাদ্দাম বাজার এলাকা। ব্যস্ততম শহরের এই মোড়ে সদর হাসপাতালে যাওয়ার রাস্তার শুরুতেই মাশরুমের দোকান। মাশরুমের তৈরি বিভিন্ন মুখরোচক খাবার তৈরি হয় এখানে। সেই সাথে মাশরুম এবং ড্রাই ও পাউডার আকারেও মাশরুম বিক্রি করা হয়। দুইজন কর্মচারী ব্যস্ত সেখানে সবসময় মাশরুমের এসব খাবার তৈরি করতে। দোকানের মালিক সাইফুল ইসলাম বসে হিসাব করছেন বেচাকেনার।
সাইফুল ইসলাম জানান, “ ২০১৮ সাল থেকে আমি মাশরুম চাষ শুরু করি। আমি বিভিন্ন কোম্পানীতে চাকুরী করি। সেখান থেকে চাকরি হারিয়ে আমি বাড়ি ফিরে এসে একটি ব্যবসা শুরু করি। সেখানে লস খেয়ে আমি দিশেহারা হয়ে যায়। তখন আমার মনে হয় চাকুরীতে থাকা অবস্থায় মাশরুমের একটা প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। মাশরুম চাষ শুরু করি। এসময় কোন টাকা পয়সা ছিলো না। খুবই কষ্ট করে মাত্র ৬হাজার টাকা ধার নিয়ে আমি মাশরুম চাষ শুরু করি। সাভার মাশরুম সেন্টার থেকে ১০০ পিস স্পন কিনে আনি। বর্তমানে আমার প্রতি চালানে ৮হাজার মতো স্পন তৈরি হয়। ১৫ হাজার মতো স্পন রাখার স্থান রয়েছে আমার খামারে। আমি আমার এখানে মাশরুমের মাদার, স্পন এবং টিস্যু কালচার করি।”
তিনি বলেন, “এক সময় আমাকে অনেকেই অনেক কটু কথা বলতো। ব্যাঙ এর ছাতা তৈরি করি বলে অনেক বন্ধুরা আমার সাথে মেশা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিলো। এগুলোতে আমি হতাশায় ভুগতাম। কিন্তু সাহস পেয়েছি কৃষি অফিসের পরামর্শ ও সহায়তায়।”
তিনি বলেন, “আমার এখানে ১৫-১৬জন কাজ করে। প্রতিদিন ৪০-৬০ কেজি মাশরুম উৎপাদন হয়। প্রতিকেজি ২০০ টাকা করে বিক্রি করি। এছাড়া একটি বিক্রয় কেন্দ্র করেছি। সেখানে দুজন শ্রমিক কাজ করে। তারা সেখানে বিভিন্ন মুখরোচক খাবার তৈরি করে মাশরুম থেকে। শুরুতে মাশরুম বিক্রি করতে পারতাম না তবে বর্তমানে মাশরুমের যে চাহিদা তাতে ড্রাই করার মতো সময় পায় না। ড্রাই করতে পারলে বিদেশে রপ্তানি করা যায়।
তিনি জানান, বর্তমানে ২৫-২৬ লাখ টাকার মতো মুলধন সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিমাসে আমার দেড় লাখ টাকা থেকে এক লাখ ৭০ হাজার টাকা আয় হয়। আমার ইচ্ছা আছে আমি সারাদেশে মাশরুমের বীজ সরবারহ করতে চাই। যার মাধ্যমে ৬০ থেকে ৮০ হাজার মানুষের বেকারত্ব দুর করতে পারবো।”
তিনি বলেন, আমার এখান থেকে প্রায় ৫শ জন এসে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ নিয়েছে আমার কাছ থেকে। তবে এর মধ্যে ১০% এখনো টিকে আছে। বানিজ্যিকভাবে উৎপাদন করছে। তবে নারীরা ঘরে বসে এ মাশরুম চাষ করতে পারছে বিধায় তারা বেশি উদ্বুদ্ধ হচ্ছে।”
তিনি আরো বলেন, “আমার এ মাশরুম চাষ, বাজারজাত এবং পরামর্শ দিয়ে সাবক্ষণিক সহযোগিতা করছে যশোর অঞ্চলে টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্প। এ প্রকল্প থেকে আমি প্রশিক্ষণ নিয়েছি মাশরুম চাষ ও বাজারজাত করণের উপরে। এছাড়া তারা আমাদের বিক্রির ব্যবস্থা করছে। সেই সাথে আমাদের প্রয়োজনীয় উপকরণ বিনামুল্যে দিয়েছে। আগামীতে ড্রাই করা এবং প্যাকেট করার জন্য কিছু মেশিনারিজ বিনামুল্যে দেওয়ার কথা রয়েছে সেগুলো পেলে আরো উপকৃত হবো।”
দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন আসে সাইফুলের এ মাশরুম খামার দেখতে। নতুন করে শিখছেন মাশরুম চাষাবাদ সম্পর্কে।
কুমারখালী থেকে আসা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, “আমি সাইফুল ভাই এর এ মাশরুম খামার দেখতে ও শিখতে এসেছি। নিজে বাড়ীতে করার জন্য। এটি বেশ লাভজনক। এজন্য আমি শিখতে এসেছি। আমার মতো অনেকেই আসছেন।”
সাইফুল ইসলামের কাছ থেকে মাশরুম চাষ শিখে বানিজ্যিক ভাবে চাষ শুরু করেছেন কুষ্টিয়ার জগতি এলাকার নারী শিরিনা আক্তার। তিনি মোবাইলে ইউটিউব থেকে সাইফুল ইসলামের কাছে মাশরুম চাষ সম্পর্কে হাতে কলমে শিখে নিজেই এখন মাশরুমের স্পন (বীজ) তৈরি করছেন এবং চাষাবাদ করছেন।
শিরিনা আক্তার বলেন, “আমি গৃহস্থলির কাজের পাশাপাশি কাঁথা সেলাই করতাম। এখন মাশরুম চাষ করছি। আমার বাড়ীতেই ছোট একটি ঘরে ৫০০ প্যাকেট মাশরুমের স্পন দিয়ে চাষ শুরু করেছি। ইতিমধ্যে মাশরুম বিক্রি শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে আমার খরচ হয়েছে ২০ হাজার টাকার মতো। আশা করছি আমি ৫০ হাজার টাকার মাশরুম পাবো এই মৌসুমেই। এটি বাড়ীতে করা যায় এবং নারীরাও বেশ সহজেই করতে পারে।”
স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাসিম রেজা জানান, “মাশরুম চাষের জন্য আলাদা করে জমির প্রয়োজন হয় না। বাড়ীতেই এ চাষ করা যায়। আমরা যশোর অঞ্চলে টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহায়তা দিচ্ছি। এই এলাকায় সাইফুলের দেখাদেখি ৩০জন কৃষক কৃষাণী মাশরুম চাষে উদ্বুদ্ধ হয়ে মাশরুম চাষ করছেন।”
কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুপালী খাতুন জানান, “আমরা মাশরুম চাষ সম্প্রসারণে যশোর অঞ্চলে টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় সাইফুল ইসলামকে চাষী প্রশিক্ষণ ও বাজারজাতকরণে উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ প্রদান করি। সেই সাথে তাকে একটি মাশরুমের প্রদর্শনী প্রদান করি। যার মাধ্যমে তিনি বানিজ্যিকভাবে মাশরুম উৎপাদন করছেন। তিনি ইতিমধ্যে শহরে একটি সেল্স সেন্টারের মাধ্যমে মাশরুম বিক্রি করছেন, এবং বিভিন্ন মুখরোচক খাবার তৈরি করে বিক্রি করছেন।”
যশোর অঞ্চলে টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক রবিউল ইসলাম জানান, “মাশরুম একটি অত্যন্তপুষ্টিকর সবজি। এটি চাষাবাদ খুবই লাভজনক। আমরা এ চাষ সম্প্রসারণে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী প্রদান করছি। সেই সাথে বাজারজাতকরণে সার্বিক সহযোগিতা করছি এবং মাশরুম উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাদের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি বিনামুল্যে বিতরণ করছি। যার মাধ্যে নতুন কৃষি উদ্যোক্তা ও চাষীরা এ মাশরুম চাষ করে বেশ সফল হচ্ছে।”
তিনি আরো বলেন, “কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার সাইফুল ইসলাম আমাদের একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা। তিনি আমাদের সহযোগিতায় মাশরুম উৎপাদন করে তিনিসহ এলাকার অনেক মানুষের কর্মস্থান সৃষ্টি করেছে।”


সম্পাদক: জাহিদ হাসান
© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | কৃষিবিডি.কম, কৃষিবিডি প্রাইভেট মিডিয়া লিমিটেডের একটি প্রতিষ্ঠান।
ইসলাম সুপার মার্কেট (২য় তলা), আমলা, মিরপুর, কুষ্টিয়া-৭০৩২।
যোগাযোগ:
০১৭৮০৮২৭৬০০,
info@krishebd.com
mail.krishebd@gmail.com
Crafted with by Softhab Inc © 2021