কুষ্টিয়ায় আমন ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের সহায়তা করছে কৃষকের বাতিঘর

প্রকাশিত: ৮:২১ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০২৩

কুষ্টিয়ায় আমন ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের সহায়তা করছে কৃষকের বাতিঘর

আমন ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য। সেদিক থেকে এর উৎপাদন বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। সে বিষয়টি বিবেচনা করে কুষ্টিয়ায় আমন ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ ও সহায়তা করছে জেলার মিরপুর উপজেলার কৃষি উন্নয়ন ও সামাজিক সংগঠন ‘কৃষকের বাতিঘর’।

রোববার (৩০ জুলাই)  ঘুরে দেখা যায়, জেলার মিরপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মাঠে ‘কৃষকের বাতিঘর’ সংগঠনের সদস্যরা ঘুরে ঘুরে কৃষকদের আমন ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিতে উদ্বুদ্ধ করছে। একইসঙ্গে তারা কৃষকের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় সাহায়তা দিচ্ছে এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার ও উচ্চ ফলনশীল জাত সম্পর্কে জানাচ্ছে। এতে সাড়া দিচ্ছেন কৃষকরাও।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ‘কৃষকের বাতিঘর’ সংগঠনটি কাজ করছে কৃষকদের সহায়তায়। স্থানীয় একদল তরুণ-তরুণীর এই স্বেচ্ছাসেবামূলক সংগঠন কৃষকদের আধুনিক কৃষি, জীব বৈচিত্র ও প্রাণ-প্রকৃতি সচেতন হয়ে চাষাবাদের জন্য সহায়তার পাশাপাশি তাদের মধ্যে শিক্ষা-সংস্কৃতির আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। কখনো বাড়ির আঙিনায়, কখনো ফসলের মাঠে বসেই স্বেচ্ছাসেবীরা বই পড়ে শোনান নিরক্ষর কৃষকদের। সহজপাঠ্যের পাশাপাশি চলে নানা বিষয়ে কথকতা আর আড্ডা। সেভাবেই জানিয়ে চলেছেন আমন ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের করণীয় সম্পর্কে।

কৃষকের বাতিঘর সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আমন ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হলে কৃষকদেরকে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। সেই সাথে আমন ধানের আধুনিক ও উচ্চ ফলনশীল জাতের সম্প্রসারণ করতে হবে। সেই বিষয়টি বিবেচনা করে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও উচ্চ ফলনশীল জাত সম্পর্কে কুষ্টিয়ার কৃষকদের অবহিত করার কাজ করছে ‘কৃষকের বাতিঘর’। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আমন ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের নিয়ে মাঠে মাঠে বিভিন্ন কর্মশালাও করছে সংগঠনটির কর্মীরা। আর এই কার্যক্রমে কৃষক, বীজ উৎপাদক ও ডিলার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।

মিরপুর উপজেলার কচুবাড়ীয়া গ্রামের কৃষক আবু তাহের জানান, বিজ্ঞানীরা নতুন ধানের জাত আবিস্কার করেছে যেগুলো নাকি অনেক বেশি ফলন দিতে সক্ষম। আমরা তো সেগুলো সম্পর্কে কখনো সেভাবে জানতেই পারিনি। এখন কৃষকের বাতিঘরের সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে এসে আমাদের এসব ধানের জাতের কথা বলেন, বীজ ও চারার ব্যবস্থা করে দেন। এখন আমরা ব্রি ধান ৮৮, ব্রি ধান ৯৬ এবং ব্রি ধান ৯২, আইআর-১ এবং ব্রি ধান ৭৯ সম্পর্কে জানি। এছাড় ভারতীয় ধানের জাত স্বর্ণার বিকল্প হিসেবে ব্রি ধান ৯৩, ব্রি ধান ৯৪ এবং ব্রি ধান ৯৫ সবচেয়ে জনপ্রিয়। তবে মাঠ পর্যায়ে আমনের সর্বোচ্চ ফলনের জাত হচ্ছে ব্রি ধান ৮৭। এসব তথ্যগুলো আমরা সাধারণ নিরক্ষর কৃষকরা আগে সেভাবে জানতাম না, তবে এখন জানি কৃষকের বাতিঘরের মাধ্যমে জানি। আর সে অনুযায়ী আমরা চাষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।

একই গ্রামের কৃষক ইসলাম আলী বলেন, ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হলে ফসলের যত্ন যেমন জরুরী, তেমনি সঠিক জাত নির্বাচন আর ঠিকভাবে পরিচর্যা করতে জানাটাও জরুরী। এছাড়া বিভিন্ন সময় পোকা-মাকড়ের আক্রমণ তো আছেই। সেগুলো থেকে রক্ষাও একটা বড় বিষয়। এই বিষয়গুলো এখন আমাদের সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয় কৃষকের বাতিঘর সংগঠনের পক্ষ থেকে। আমরা এখন আধুনিক চাষ সম্পর্কে একটু আধটু হলেও জানি।

এই কার্যক্রম নিয়ে কৃষকের বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক হোসাইন মোহাম্মদ সাগর বলেন, ১৯৭২ সালের তুলনায় বর্তমানে ধানের উৎপাদন চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে ধানের চাহিদা বাড়ছে। ধানের উৎপাদন স্থিতিশীল থাকলে হবে না। এজন্য ধানের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। ধানের জাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, প্রচলিত শস্য বিন্যাস উন্নয়নের মাধ্যমে ধান ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। আর বর্তমান প্রজন্ম মাঠে গিয়ে কাজ করতে আগ্রহী নয়। এজন্য কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সেদিক থেকেই আমন ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাজ করছে কৃষকের বাতিঘর।

এ বিষয়ে ‘যশোর অঞ্চলের টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্প’-এর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, বৃহত্তর যশোর অঞ্চলে টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশের মানুষের টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ের সকলকে সার্বক্ষণিকভাবে তৎপর থাকতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা সুসংহত করতে না পারলে আমাদের পরনির্ভরশীলতা তৈরি হবে যা কখনোই কাম্য নয়। বিশ্বব্যাপী চলমান সংকটে নিজেদের খাদ্য নিজেদের উৎপাদন করতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। অধিক ফলনের জন্য বিজ্ঞানীদের পরামর্শ মতে মাটি অনুযায়ী উপযুক্ত জাত নির্বাচন করতে হবে। তাই খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে ২০৩০, ২০৪০, এবং ২০৫০ সালের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তা বাস্তবায়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও সকলকে এগিয়ে আসতে হবে, সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এদিক থেকে কৃষকের বাতিঘরের এই কার্যক্রম সাধুবাদ পাওয়ার মতো।