কুষ্টিয়া ২৮শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০:৫৮ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২৬
পাহাড়ের ঢালে সবুজের সমারোহ। আর সেই সবুজের বুক চিরে সুবাস ছড়াচ্ছে রসালো ফল আনারস। তবে এটি যেমন-তেমন আনারস নয়, এটি পার্বত্য জেলা রাঙামাটির বিখ্যাত ‘হানিকুইন’ বা ‘মধু রানী’ জাতের আনারস। নামের মতো এর স্বাদও যেন খাঁটি মধু।
চলতি মৌসুমে রাঙামাটির পাহাড়গুলোতে হানিকুইন আনারসের বাম্পার ফলন হয়েছে। এসব আনারস এখন স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে তৃপ্ত করছে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারাদেশের ফলপ্রেমীদের। আর এই আনারসকে কেন্দ্র করেই পাহাড়ের শত শত জুমচাষি ও সাধারণ পরিবারের ভাগ্যবদল হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার নতুন দিগন্ত।
রাঙ্গামাটির বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, পাহাড়ের ঢালু জমিতে থরে থরে সাজানো আনারস বাগান। বিশেষ করে রাঙামাটি সদর, নানিয়ারচর, কাউখালী, লংগদু এবং বাঘাইছড়ি উপজেলায় এবার আনারসের ব্যাপক ফলন হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাঙামাটির আবহাওয়া এবং মাটি আনারস চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানে মূলত দুই জাতের আনারসের চাষ বেশি হয় ‘জায়ান্ট কিউ’ (যা আকারে বেশ বড় ও কিছুটা টক-মিষ্টি) এবং ‘হানিকুইন’। তবে স্বাদে অনন্য, মিষ্টি ও সুগন্ধযুক্ত হওয়ায় বাজারে হানিকুইন জাতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এই জাতের আনারস আকারে কিছুটা ছোট ও ওজনে হালকা হলেও এর ভেতরের অংশটি হয় টকটকে হলুদ এবং রসে টইটম্বুর।
নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট এলাকার আনারস চাষি সুরেশ চাকমা বলেন, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাহাড়ের হানিকুইন আনারসের সাইজ এবং মিষ্টি দুটোই দারুণ হয়েছে। আমরা জুমের পাশাপাশি এখন বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করছি। গত বছরের তুলনায় এবার দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে।
আনারসের মৌসুমকে কেন্দ্র করে রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর, কাউখালীর ঘাগড়া বাজার, সদরের সমতা ঘাট এবং কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকায় এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। প্রতিদিন ভোর হতেই চাষিরা দূর-দূরান্তের পাহাড় থেকে কলাপাতায় মুড়িয়ে, বাঁশের ঝুড়ি (হাল্লোং) ভরে এবং নৌকা বোঝাই করে আনারস নিয়ে আসছেন স্থানীয় বাজারগুলোতে।
চট্টগ্রাম থেকে আসা পাইকারি ফল ব্যবসায়ী মো. ইসমাইল হোসেন জানান, ‘রাঙ্গামাটির হানিকুইন আনারসের চাহিদা ঢাকা-চট্টগ্রামের বাজারে আকাশচুম্বী। এই আনারস কাটলে পুরো ঘর সুবাসে ভরে যায়। আমরা সরাসরি ঘাট থেকে আকারভেদে আনারস কিনে ট্রাকে করে নিয়ে যাই। প্রতিদিন নানিয়ারচরের বাগান থেকেই কোটি টাকার আনারস দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চালান হচ্ছে।’
একসময় পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জীবিকা কেবল প্রথাগত জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জুমচাষিরা ফল চাষের দিকে ঝুঁকছেন, যার মধ্যে আনারস অন্যতম। হানিকুইন আনারস চাষ করে পাহাড়ের শত শত পরিবার এখন দারিদ্র্য দূর করে সচ্ছলতার মুখ দেখছেন।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক একর পাহাড়ি জমিতে আনারস চাষ করতে খরচ হয় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। আর আবহাওয়া ভালো থাকলে সেই জমির আনারস বিক্রি করা যায় ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক মৌসুমেই বিনিয়োগের দ্বিগুণ বা তিনগুণ লাভ করা সম্ভব। এই আয়ের টাকা দিয়ে কৃষকরা তাদের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছেন, পাকা বাড়ি তৈরি করছেন এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করছেন।
তবে বাম্পার ফলন এবং ভালো দামের মুখেও রাঙ্গামাটির আনারস চাষিদের কিছু স্থায়ী ক্ষোভ ও সমস্যা রয়েছে। কৃষকদের প্রধান সমস্যা হলো হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজের অভাব এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা।
কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, আনারস একটি অত্যন্ত পচনশীল ফল। পেকে যাওয়ার পর ৩-৪ দিনের মধ্যে বাজারজাত করতে না পারলে এটি পচে যায়। রাঙ্গামাটিতে কোনো হিমাগার না থাকায় অনেক সময় চাষিরা বাধ্য হয়ে কম দামে পাইকারদের কাছে বিক্রি করে দেন। এতে কুষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আরেক কৃষক সুমন চাকমা বলেন, দুর্গম পাহাড় থেকে মূল সড়কে বা ঘাটে আনারস নিয়ে আসতে যাতায়াত খরচ অনেক বেশি পড়ে যায়। রাঙ্গামাটির অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোর উন্নয়ন করা গেলে চাষিরা আরও বেশি লাভবান হতেন। চাষি এবং পাইকারি ক্রেতা সবারই উপকার হতো। তরতাজা ফলগুলো ভোক্তাদের কাছে দ্রুত পৌঁছানো যেত।
রাঙ্গামাটির কৃষি উদ্যোক্তা সুবিমল চাকমা বলেন, এখানে কোনো জুস ফ্যাক্টরি বা ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র নেই। যদি সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে একটি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা যেত, তাহলে উদ্বৃত্ত আনারস থেকে জুস, জ্যাম বা জেলি তৈরি করে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হতো।
রাঙ্গামাটি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ফলন ধরা হয়েছে ৩৪ মেট্রিক টন। এবার মোট উৎপাদন হয়েছে ৯০ হাজার ৪৩৯ মেট্রিক টন। গত অর্থ বছরের তুলনায় উৎপাদন বেড়েছে ২৪ হাজার ৮৬৫ মেট্রিক টন। প্রতি বছরই আনারস চাষের পরিধি বাড়ছে। চলতি বছর রাঙামাটি জেলায় রেকর্ড পরিমাণ জমিতে আনারসের চাষ হয়েছে, যার সিংহভাগই হানিকুইন।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, তারা কৃষকদের আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আনারস চাষের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। বিশেষ করে হরমোন বা ক্ষতিকর রাসায়নিক মুক্ত ‘অর্গানিক’ আনারস চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাহাড়ের ঢালে আনারস চাষ করার সময় যাতে মাটির ক্ষয় না হয়, সেজন্য বিশেষ লাইনিং পদ্ধতি শেখানো হচ্ছে।
রাঙ্গামাটি কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক মনিরুজ্জামান বলেন, রাঙামাটির হানিকুইন আনারস এ অঞ্চলের একটি ব্র্যান্ড। চাষিরা যাতে ফলের সঠিক মূল্য পান, সেজন্য আমরা বড় বড় চেইনশপ ও করপোরেট বায়ারদের সঙ্গে স্থানীয় চাষিদের লিংক করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। এছাড়া পাহাড়ে একটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার স্থাপনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।


সম্পাদক: জাহিদ হাসান
© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | কৃষিবিডি.কম, কৃষিবিডি প্রাইভেট মিডিয়া লিমিটেডের একটি প্রতিষ্ঠান।
ইসলাম সুপার মার্কেট (২য় তলা), আমলা, মিরপুর, কুষ্টিয়া-৭০৩২।
যোগাযোগ:
০১৭৮০৮২৭৬০০,
info@krishebd.com
mail.krishebd@gmail.com
Crafted with by Softhab Inc © 2021