কাঁঠালের খোসা থেকে পরিবেশবান্ধব ‘চামড়া’

প্রকাশিত: ১০:৪৫ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২৬

কাঁঠালের খোসা থেকে পরিবেশবান্ধব ‘চামড়া’

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়নের জোয়ারে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে এক অভূতপূর্ব নীরব বিপ্লব শুরু হয়েছে। পশুর চামড়া ব্যবহার নিয়ে বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান নৈতিক বিতর্ক এবং কৃত্রিম বা সিনথেটিক চামড়ার মারাত্মক পরিবেশগত ক্ষতির প্রেক্ষাপটে গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই খুঁজছিলেন সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প। আর এই অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে এবার উঠে এসেছে বাংলাদেশের জাতীয় ফল ‘কাঁঠাল’।

এক সময় যা কেবলই আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেওয়া হতো, সেই কাঁঠালের খোসা, বোঁটা ও ভেতরের আঁশ থেকে এখন তৈরি হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের উন্নত উদ্ভিজ্জ চামড়া বা ‘ভেগান লেদার’ (Vegan Leather)। বিশ্বখ্যাত গবেষক ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো প্রমাণ করেছে যে, কাঁঠালের বর্জ্য ব্যবহার করে সফলভাবে পরিবেশবান্ধব চামড়া তৈরি সম্ভব, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্লাস্টিক ও পশুর চামড়ার শক্তিশালী বিকল্প হয়ে উঠছে।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সামনে এই চামড়া শিল্প এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে। আমাদের দেশে প্রতি বছর উৎপাদিত লাখ লাখ টন কাঁঠালের প্রায় ৬০ শতাংশই বর্জ্য হিসেবে অবহেলিত থাকে। এই বিশাল পরিমাণ বর্জ্যকে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ‘সবুজ সোনা’ বা গ্রিন গোল্ডে রূপান্তর করা সম্ভব।

যদি সঠিক উপায়ে এই নতুন বায়োপলিমার প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ করা যায়, তবে আগামী এক দশকে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী চামড়া শিল্পের পাশাপাশি এই ‘ভেগান লেদার’ খাত বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় এনে দিতে পারে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বাংলাদেশ ভ্যালু চেইন ডিজাইন রিপোর্টের তথ্যমতে, এই ফেলে দেওয়া অংশ থেকেই এখন বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে উচ্চমানের বায়োপলিমার লেদার, যা দেখতে হুবহু পশুর চামড়ার মতোই মসৃণ, দীর্ঘস্থায়ী ও ফ্লেক্সিবল বা নমনীয়।

দেশীয় বড় বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও শিল্পগ্রুপগুলোকে এই গ্রিন ভেঞ্চারে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ‘গ্রিন ফান্ডিং’ বা সবুজ ঋণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

সবশেষে কাঁঠাল থেকে চামড়া তৈরি কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং একুশ শতকের অন্যতম বাস্তবমুখী পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন। বাংলাদেশ যদি এই নতুন সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে, তবে বিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগযুক্ত পরিবেশবান্ধব জ্যাকেট, ওয়ালেট কিংবা জুতো এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবে। এখন প্রয়োজন সমন্বিত সরকারি নীতি, কৃষি গবেষক ও চামড়া শিল্প মালিকদের মেলবন্ধন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে কার্যকর কূটনৈতিক সংযোগ।