কুষ্টিয়া ২৮শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০:৫২ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২৬
মিশরে ফলের বৈচিত্র্য ও কৃষি সংস্কৃতি বেশ এগিয়ে। নীলনদের উর্বর পলিমাটি, অনুকূল আবহাওয়া এবং হাজার বছরের কৃষি ঐতিহ্যের কারণে দেশটি প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল উৎপাদনের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল, নারিকেল ও আনারসের মতো কিছু ফল মিশরে দেখা না গেলেও দেশটিকে যথার্থই বলা হয় ‘ফলের স্বর্গরাজ্য’। আর এই স্বর্গরাজ্যের অন্যতম প্রধান সম্পদ হলো খেজুর। প্রাচীনকাল থেকেই মিশরের সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও অর্থনীতিতে খেজুরের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত নানা জাতের খেজুর শুধু স্থানীয় চাহিদাই পূরণ করে না বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি করা হয়।
মিশরের বিখ্যাত ফলের তালিকায় রয়েছে আম, কমলা, মাল্টা, আঙুর, বেদানা, ডুমুর, আলো-বোখারা, তরমুজ, বাঙ্গি ও স্ট্রবেরি। বিশেষ করে কমলা ও সাইট্রাস জাতীয় ফল আন্তর্জাতিক বাজারে মিশরের পরিচিতি বহন করে। নীলনদের তীরবর্তী কৃষি এলাকাগুলোতে এসব ফলের চাষ হয়।
প্রবাসী ব্যবসায়ী আল-আমিন বলেন, এখানে ফলের দাম তুলনামূলক সস্তা এবং মান অত্যন্ত চমৎকার। প্রবাসীদের দৈনিক খাদ্য তালিকায় ফলের উপস্থিতি থাকে চোখে পড়ার মতো। প্রবাসীরা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন মিশরীয় আম, ডুমুর এবং তাজা জাইতুন (অলিভ)।
তিনি বলেন, এখানকার আমের স্বাদ আমাদের দেশের আম্রপালি বা হিমসাগরের চেয়ে আলাদা হলেও, অত্যন্ত মিষ্টি ও আঁশহীন। এছাড়া আরবের ঐতিহ্যবাহী তাজা খেজুর এবং ডুমুর প্রবাসীরা খুব পছন্দ করে খান। মিশরের বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে উৎপাদিত তরমুজ ও খরমুজও (ক্যান্টালুপ) গরমের সময় প্রবাসীদের তৃষ্ণা মেটায়।
আফসোস করে আরেক প্রবাসী লিয়াকত আলী বলেন, মিশরে ফলের প্রাচুর্য থাকলেও কিছু ফল এখানে একেবারেই পাওয়া যায় না, যা প্রবাসীদের প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। বিশেষ করে বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠালের দেখা মেলে না। এছাড়া কাঁচা আম, জামরুল, লটকন, আমড়া, কামরাঙ্গা এবং জামের মতো দেশীয় টক-মিষ্টি ফলগুলো মিশরে পাওয়া যায় না।
কায়রোতে চাকরিজীবী মো. সুমন হোসেন আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘মিশরে মাল্টা, আঙুর বা ডুমুর যত কম দামেই পাই না কেন, দেশের একটা লটকন বা কামরাঙ্গার স্বাদ এখানে কোটি টাকা দিলেও মিলবে না।
তিনি বলেন, বিশেষ করে বর্ষাকালে কাঁঠালের গন্ধ আর কাঁচা আমের ভর্তা আমরা খুব মিস করি। মাঝে মধ্যে দেশ থেকে কেউ এলে দুই-একটা কাঁঠাল বা আমড়া নিয়ে আসে, তখন মনে হয় যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছি। এই ফলগুলো এখানে পাওয়া যায় না, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আফসোস।
মিশরের আমের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে ইসমাইলিয়া ও ফাইয়েদ অঞ্চলের নাম। এই দুই এলাকাকে বলা হয় মিশরের ‘আমের রাজধানী’। এখানকার উৎপাদিত আমের মধ্যে আওয়িস জাতের আমকে বলা হয় ‘আমের রাজা’।
এছাড়াও ফাস, সিদিকা, আলফন্স, তাইমুর, জেবদা, সুক্কারি, নাওমি, মেঙ্গা-ইল হিন্দ ও কিতসহ বিভিন্ন জাতের আম মিশরের কৃষি ঐতিহ্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব আমের স্বাদ, ঘ্রাণ ও বৈচিত্র্য দেশি-বিদেশি ফলপ্রেমীদের আকর্ষণ করে।
আমের পরেই মিশরের জনপ্রিয় ফলের তালিকায় রয়েছে কমলা ও আঙুর। বাংলাদেশে যেখানে এক কেজি কমলার কিনতে গুনতে হয় ৩ থেকে ৪ শত টাকা সেখানে মিশরের স্থানীয় বাজারে বাগান থেকে সদ্য সংগ্রহ করা এক কেজি তাজা কমলা মাত্র ত্রিশ টাকায় পাওয়া যায়। একইভাবে গাছ থেকে সংগ্রহ করা রসালো ও রঙিন আঙুরও পাওয়া যায় ৮০ থেকে একশত টাকা কেজি।
মিশরে কমলার রয়েছে নানা জাত ও পরিচিতি। উস্তাফান্দি, ম্যান্ডারিন, বালাদি, ভ্যালেন্সিয়া, নাভেল ও সুক্কারি কমলা অন্যতম। অন্যদিকে আঙুরের মধ্যে রয়েছে বেনাতি, থম্পসন সিডলেস, ফ্লেম, রেড গ্লোব ও সুপিরিয়র সিডলেসসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় জাত।
এদেশে গ্রীষ্মকালীন ফলের মধ্যে তরমুজ ও বিভিন্ন জাতের মেলন বা বাঙ্গির চাহিদা ব্যাপক। প্রচণ্ড গরমের সময় এসব ফল শুধু স্বাদের উৎস নয়, শরীরকে সতেজ রাখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। অন্যদিকে শীত মৌসুমে কমলা, ম্যান্ডারিন ও স্ট্রবেরির বাজার জমে ওঠে।
ফল চাষ মিশরের কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। হাজার হাজার কৃষক, ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারক এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। দেশটির কৃষিপণ্য রপ্তানিতেও ফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস হিসেবে কাজ করছে।
ফল দিবস শুধু ফলের স্বাদ উপভোগের দিন নয়; এটি কৃষক, প্রকৃতি ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির প্রতি সম্মান জানানোরও একটি উপলক্ষ। মিশরের ফলের বৈচিত্র্য নীল নদের আশীর্বাদ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও সমৃদ্ধ কৃষি ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।
ফল ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিশর থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সাইট্রাস বা লেবুজাতীয় ফল বাংলাদেশে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় মাল্টা ও কমলা। উজ্জ্বল রঙ, পাতলা চামড়া এবং অতিরিক্ত মিষ্টি ও রসালো হওয়ার কারণে বাংলাদেশের বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
এছাড়া মিশর থেকে উচ্চমানের বেদানা (ডালিম), আঙুর এবং প্রিমিয়াম কোয়ালিটির শুকনো খেজুর নিয়মিত বাংলাদেশে রফতানি করা হয়। বিশেষ করে অফ-সিজনে যখন দেশীয় ফলের সরবরাহ কমে যায়, তখন মিশরীয় মাল্টা ও আঙুর বাংলাদেশের বাজার ধরে রাখে।
বর্তমানে মিশরের কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়াসহ বিভিন্ন শহরের বড় বড় ফলের আড়ত এবং বাগানগুলোতে শত শত বাংলাদেশি শ্রমিক ও ব্যবসায়ী কাজ করছেন। তারা মিশরীয় ফল স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করে বাংলাদেশে রপ্তানির প্রক্রিয়াও সহজ করছেন।
দুই দেশের মধ্যে সরাসরি কার্গো বিমান চলাচল এবং শুল্ক জটিলতা কমলে মিশর থেকে আরও বৈচিত্র্যময় ফল কম মূল্যে বাংলাদেশের বাজারে আনা সম্ভব হবে, যা একই সাথে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও দেশের ফলের চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখবে।


সম্পাদক: জাহিদ হাসান
© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | কৃষিবিডি.কম, কৃষিবিডি প্রাইভেট মিডিয়া লিমিটেডের একটি প্রতিষ্ঠান।
ইসলাম সুপার মার্কেট (২য় তলা), আমলা, মিরপুর, কুষ্টিয়া-৭০৩২।
যোগাযোগ:
০১৭৮০৮২৭৬০০,
info@krishebd.com
mail.krishebd@gmail.com
Crafted with by Softhab Inc © 2021